Tuesday , November 24 2020
Home - কৃষি ও কৃষক - বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষক

বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষক

কৃষি ডেস্ক : বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান দেশ। দেশের শতকরা ৮০ ভাগ লোক প্রত্যক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। দেশের অধিকাংশ লোকের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র উপায় হচ্ছে কৃষি। কারণ কৃষক কৃষির উন্নতির ওপর দেশের উন্নতি নির্ভর করে। কৃষি কৃষক হলো বাংলাদেশের প্রাণ। পলিমাটি সমৃদ্ধ বাংলার মাঠে ময়দানে যে বিশাল সবুজের সমারোহ দেখা যায় তার প্রায় সবই কৃষিজাত দ্রব্য। আর সারাক্ষণ হাড়ভাঙ্গা খাঁটুনি দিয়ে যেসব মানুষ বিপুল ফসল উৎপাদন করে তারাই কৃষক নামে পরিচিত। বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। বাংলাদেশ মানেই গ্রাম বাংলা, পল্লীবাংলা, মাটি মানুষের বাংলা

এক কথায় গোটা বাংলাই কৃষি নির্ভর। সুতরাং কৃষি নির্ভর বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষই কৃষিজীবী এবং সমাজে তারা খেটে খাওয়া কৃষক হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নতি অগ্রগতিতে কৃষি কৃষক কেবল গুরুত্বপূর্ণই নয়, অপরিহার্য। এখানে কৃষি উৎপাদন ভালো হলে জাতীয় অর্থনীতি হয়ে ওঠে সবল সমৃদ্ধ। কিন্তু কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হলে দেশে আসে অভাব দুর্যোগ। বাংলাদেশের কৃষি কৃষক কেবল খাদ্য উৎপাদনেই নয়, পুষ্টি, সমস্যা সমাধানে, শিল্পায়নে, রপ্তানি আয় বৃদ্ধিতে, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এবং সর্বোপরি জাতীয় আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমাদের দেশে উৎপাদিত পণ্যের অধিকাংশই আসে কৃষি থেকে।
খাদ্য নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য থেকে শুরু করে শিল্পের কাঁচামাল পর্যন্ত সবকিছুর যোগান দেয় কৃষি। বাংলাদেশের কৃষকরা একসময় গৌরবময় জীবন যাপন করতো।গোলা ভরা ধান আর গোয়াল ভরা গরুছিল প্রতিটি কৃষকের বাড়িতে। পুকুরে ছিল মাছ। মোটা ভাত, মোটা কাপড়ের অভাব হয়নি কোনদিন বাংলা কৃষকের। অবশ্য এর পেছনে কারণ ছিল। তখন দেশের লোকসংখ্যা ছিল কম, জমি ছিল পর্যাপ্ত। কৃষকদের মহাজনের ঋণের বোঝা বইতে হতো না। তখনকার দিনে কৃষকের স্বাস্থ্য ছিল সবল। মনোবল ছিল অটুট। তাদের সমাজজীবনে বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠান ছিল। মোট কথা, কৃষকের নিজের হাতে গড়া সোনার বাংলাধনৈশ্বর্যে ভরপুর ছিল। বাংলার কৃষক সুখে দিন যাপন করতো। বর্তমানে বাংলাদেশের কৃষকের কথা মনে পড়লে আমাদের সামনে ভেসে ওঠে এক রোগজীর্ণ অস্থিকঙ্কালসার দৈন্যের চরম প্রতিমূর্তি। পরণে বস্ত্র নেই, মুখে চরম হতাশা নৈরাজ্যের ছাপ, দারিদ্র, ব্যাধি, কুসংস্কার, অশিক্ষা তাকে ঘিরে রাজত্ব করছে। বাংলাদেশের কৃষকের করুণ অবস্থার পেছনে বহুবিধ কারণ রয়েছে। আমাদের কৃষিতে এখনো পুরোপুরিভাবে বিজ্ঞানের ছোঁয়া লাগেনি। দেশের কৃষকরা এখনো নানা অঞ্চলে মানন্ধাতার আমলের পদ্ধতিতে জমি চাষাবাদ করে থাকে। ফলে উৎপাদন হয় অত্যন্ত কম।
ফসল উৎপাদনের পর কৃষিঋণ এবং মহাজনের দেনা পরিশোধ করার জন্য কমদামে কৃষককে সব ফসল বিক্রয় করতে হয়। ফলে কৃষক প্রকৃত মূল্য থেকে বঞ্চিত হয়। বাংলাদেশের কৃষকদের এক বিরাট অংশ ভূমিহীন। তারা অন্যের জমি চাষ করে। তাই উৎপাদিত ফসলের বেশির ভাগই মালিকের নিকট চলে যায়।
ফলে কৃষক দরিদ্র থেকে যায়। দেশে শুষ্ক মৌসুমে বৃষ্টিপাত হয় না। শুষ্ক মৌসুমে সেচের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন করার জন্য গভীর নলকূপ বসানোর সামর্থ্য কৃষকের থাকে না। অনেক সময় কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে তা সরবরাহ করা হয় না। ফলে উৎপাদন দারুণভাবে ব্যাহত হয়। এছাড়া বন্যা, খরা, জলোচ্ছাস ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতি বছর হাজার হাজার একর জমির ফসল ভাসিয়ে নিয়ে যায় বা নষ্ট করে দেয়।
ফলে কৃষকের দৈন্য আরো বেড়ে যায়। সর্বোপরি জমির খন্ডবিখন্ডতা, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, কৃষিখাতে ভর্তুকির অভাব, অজ্ঞতা ইত্যাদি কারণে কৃষকের ভাগ্যের উন্নতি ঘটছে না। কৃষি কৃষকের অবস্থার উন্নতির জন্য আমাদের বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। কৃষকের নিজস্ব জমির ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনের সময় কম দানে কৃষকদের সার কীটনাশক সরবরাহ করতে হবে। কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য দিতে হবে। পচনশীল ফসল সংরক্ষণের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ তথা কলের লাঙ্গল দ্বারা জমি চাষের সুযোগ করে দিতে হবে। কৃষকরা যাতে কম মূল্যে আর, কীটনাশক, সেচযন্ত্র অন্যান্য কৃষি যন্ত্রপাতি পায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। আধুনিক চাষ পদ্ধতি সম্বন্ধে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
তাছাড়া কৃষকদের মধ্যে শিক্ষার বিস্তার ঘটিয়ে, খামার পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে, কৃষিখাতে অধিকহারে ভর্তুকি দিয়ে কৃষকদের অসুবিধা সমূহ অনেকাংশে লাঘব করা যায় বাংলাদেশে কৃষির গুরুত্ব অপরিসীম। দেশে যে বছর কৃষি উৎপাদন ভালো হয় সে বছর কোনো অভাব থাকে না। পক্ষান্তরে কৃষি উৎপাদন খারাপ হলে দেশে চরম অভাব বিরাজ করে। তাই কৃষি নির্ভর দেশে কৃষিকে বাদ দিয়ে উন্নতির কথা ভাবাই যায় না। কৃষির গুরুত্বের কথা উপলব্ধি করে আমাদের দেশে কৃষি বিপ্লব ঘটাতে হবে। তাহলেই আমরা এদেশের ষোল কোটি মানুষের মুখে হাসি দেখতে পাব। কৃষি প্রধান বাংলাদেশের কৃষির উন্নতির জন্য প্রথমে কৃষকদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানে সচেষ্ট হতে হবে। কারণ কৃষক কৃষির উন্নতির মধ্যেই আমাদের কল্যাণ নিহিত রয়েছে। মাথা ছাড়া যেমন মানবদেহে ভাবা যায় না, তেমনি কৃষির উন্নতি ছাড়া আমাদের অর্থনীতির উন্নতির কথা ভাবা যায় না। তাই, বৈজ্ঞানিক চাষ পদ্ধতির মাধ্যমে কৃষির উন্নতি ঘটাতে পারলেই আমাদের অর্থনীতির মরা গাঙ্গে জোয়ার আসবে। তখন সোনার বাংলা ভরে উঠবে ধনেধান্যে, পুষ্প পল্পবে