Monday , August 30 2021
Home - ভিন্ন খবর - আফগানিস্তান নিয়ে আঞ্চলিক রাজনীতিতে অস্থিরতা

আফগানিস্তান নিয়ে আঞ্চলিক রাজনীতিতে অস্থিরতা

একটি দেশের ভৌগোলিক অবস্থা এবং ভৌগোলিক উপাদান একটি দেশকে যেমন শক্তিশালী করতে পারে, তেমনি অভ্যন্তরীণ নীতির কারণে দুর্বলও করতে পারে। দুর্বলতার কারণে ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, যা ভৌগোলিক অবস্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত ইত্যাদির কারণে ভৌগোলিক অভিশাপও হতে পারে। এ অঞ্চলের আফগানিস্তান এর অন্যতম দৃষ্টান্ত। মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশটির ইতিহাসে যা ঘটেছে, তা ভৌগোলিক অভিশাপ ছাড়া আর কিছুই নয়। আফগানিস্তানের ভূমিবিন্যাস এমনই যে এই দেশকে বশে রাখা বা দখলে রাখা সব সময়ই দুষ্কর। যার কারণে এ দেশকে বলা হয় ‘সাম্রাজ্যে সমাধি’। এর সর্বশেষ প্রমাণ যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পরাজয়।

প্রখ্যাত সাংবাদিক এবং বৈদেশিক নীতি বিশেষজ্ঞ টিম মার্শালের একটি বহুল পঠিত বই প্রিজনারস অব জিওগ্রাফি। বইটিতে তিনি একটি দেশের এবং অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান কীভাবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতিকে প্রভাবিত করে এবং ভূকৌশলগত অবস্থান নির্ণয় করতে অবদান রাখে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

আফগানিস্তানের পূর্ব প্রান্তে পাকিস্তান, উত্তর-পূর্বে ক্ষুদ্রতম সীমান্ত হলে ভূকৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ চীনের অবস্থান। চীনের সঙ্গে ওয়াখান করিডর নামক এই সীমান্ত কৌশলগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চীনের উইঘুর মুসলিম-অধ্যুষিত অঞ্চলের সঙ্গে এবং চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর সংযোগের পথ। এই যোগাযোগ নেটওয়ার্ক কারাকোরাম হাইওয়ে নামে পরিচিত এবং চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) অংশ। এই বহুমুখী মহাসড়ক পাকিস্তানের আরব সাগরের তীরে চীনের নির্মিত গোয়দার বন্দরকে যুক্ত করে। অপরদিকে পাকিস্তানের প্রধান বন্দর করাচির সঙ্গে আফগানিস্তানের কান্দাহারের সীমান্ত শহরের যুক্ততা রয়েছে। অপর সীমান্তে যোগাযোগ পথ পাকিস্তানের খাইবার গিরিপথ। ভূবেষ্টিত আফগানিস্তান ভৌগোলিক কারণে যোগাযোগব্যবস্থার জন্য পাকিস্তানের ওপর নির্ভরশীল।

আফগানিস্তানের পশ্চিম সীমান্তজুড়ে রয়েছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান। ইরানের বন্দর ‘চাবাহার’ পশ্চিম আফগানিস্তানের সঙ্গে নৌযোগাযোগের পথ। চাবাহার কার্যত দুটি পৃথক বন্দরে বিভক্ত। ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে এর লাগোয়া বন্দর ‘শহিদ বেহেস্তি’র উন্নয়নে ভারত ২০০৩ সালে উদ্যোগ নেয়। ইরানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে এই উন্নয়নকাজ ধীরগতিতে চলে। ২০১৬ সালের চুক্তি অনুযায়ী ইরান বন্দরের ১৬টি বার্থের মধ্যে একটি বার্থ ভারতকে পুরোপুরি ব্যবহারের জন্য অনুমতি দেয়।

আফগানিস্তানের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর মধ্যে ইরান, রাশিয়া, চীন ও পাকিস্তান এবং যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেহেতু একটি সমঝোতা হয়েছে, তাই এসব দেশ আফগানিস্তানে শান্তিপূর্ণ উপায়ে পরবর্তী সরকার গঠিত হবে। আফগানিস্তানে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা বাড়ানোর লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র, আফগানিস্তান, পাকিস্তান কূটনৈতিক গ্রুপ তৈরি করেছে। অন্যদিকে চীন-পাকিস্তান পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে আফগানিস্তানে ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা সম্পন্ন করে পাঁচ দফা করণীয় নির্ধারণ করেছে। তা ছাড়া ২০১৬ সালে গঠিত চীন-পাকিস্তান-রাশিয়া গ্রুপও সক্রিয় রয়েছে।

লক্ষণীয় হচ্ছে আফগানিস্তানকে ঘিরে চীনের ভূরাজনীতির ও ভূকৌশলের যে পরিবর্তন হচ্ছে, তাতে ভারত আফগান নীতিসহ ভূকৌশলগত জটিলতায় পড়েছে। বিশেষ করে দেখা যাচ্ছে চীন ও পাকিস্তান অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে আফগানিস্তানকে ঘিরে কৌশল নিচ্ছে। ১৯৭৩ সালে আফগান বাদশাহ জহির শাহকে সরিয়ে মোহাম্মদ দাউদের ক্ষমতা গ্রহণ ও সমাজতন্ত্র কায়েমের পর সেখানে অনেক রাজনৈতিক উত্থান-পতন ঘটলেও পাকিস্তানের সঙ্গে আফগানিস্তানের সম্পর্ক তালেবান শাসনের চার বছর (১৯৯৬-২০০১) ছাড়া কখনো ভালো ছিল না। বর্তমান আশরাফ গনি সরকার ভারতের দিকে শুধু ঝুঁকেই নেই, বরং সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতার বার্তা প্রকাশ করছে। মাত্র কয়েক দিন আগেই দিল্লির আফগান রাষ্ট্রদূত ভারতের কাছে সামরিক সাহায্য চেয়েছেন।

আফগানিস্তানে তালেবানের পতনের পর ভারত সেখানে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন, মহাসড়ক তৈরি, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে তিন বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। আফগানিস্তানের বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যে বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ অনেকটাই অনিশ্চিত। অপরদিকে চীনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এখন বৈরিতার পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। ২০২০ সালে গালওয়ান উপত্যকায় সংঘর্ষের পর চীন ভারতের লাদাখসহ পূর্বে অরুণাচল সীমান্তে সেনা তৎপরতা বাড়ালে ভারত তা মোকাবিলায় ৫০ হাজার সেনা মোতায়েন করেছে বলে জানা যায়। ভারতের এই উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন রয়েছে। সুতরাং আফগানিস্তান ইস্যুতে ভারতকে শুধু পাকিস্তান বা তালেবান নয়, অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে অনেক শক্তিশালী চীনের সঙ্গেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হচ্ছে।

চীন আফগানিস্তানে উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং তালেবানের মতে চীন আফগানিস্তানের বন্ধু। চীনের আশু উদ্দেশ্য আফগানিস্তানের উন্নয়নে ব্যাপক অংশগ্রহণ এবং চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের সঙ্গে দেশটিকে যুক্ত করা। চীনের অর্থলগ্নি রয়েছে আফগান তামাখনিতে এবং লোহা ও সিরামিকখনিতে বিনিয়োগের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতির সমাপ্তির পর যে দেশটি সেখানে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করবে, সেটি হচ্ছে চীন। চীনের অর্থনৈতিক লগ্নির সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো আর কোনো দেশ নেই। তালেবান যেন চীনের কোনো গোষ্ঠীকে মদদ না দেয়, সেটাই চীনের একমাত্র বিবেচনার দিক। তালেবান নেতৃত্ব ইতিমধ্যে চীনকে আশ্বস্ত করেছে যে ‘উইঘুর’ চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়।

এ অঞ্চলের দ্রুত বদলে যাওয়া ভূরাজনীতিতে চীন ও পাকিস্তান এ পর্যন্ত অত্যন্ত সাবধানী পথ অবলম্বন করছে। বাংলাদেশ এখন হয়তো পর্যবেক্ষণ পর্যায়ে রয়েছে, তবে ব্র্যাকের মাধ্যমে আফগানিস্তানের উন্নয়নে ২০ বছর ধরে দু-একটি ঘটনা ছাড়া নির্বিঘ্নে কাজ করছে। হয়তো এই পথ ধরেই আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলে বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। মধ্য এশিয়ায় যোগাযোগ বাড়ানো বাংলাদেশের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে। আফগানিস্তানের বর্তমান সমস্যা সংঘাত নয়, শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধান হবে—সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।